অবশেষে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ জামায়াত-শিবির

প্রজ্ঞাপন জারী

Aug 2, 2024 - 08:09
Aug 2, 2024 - 08:25
অবশেষে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ জামায়াত-শিবির

অনলাইন ডেস্কঃ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলো।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে সরকার নির্বাহী আদেশে জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ধারায় জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে যুক্তিসংগত কারণ থাকলে তার ভিত্তিতে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই ব্যক্তিকে

তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে।

সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবার নিয়ে দলটি চারবার নিষিদ্ধ হলো। ১৯৫৯ ও ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর অন্য সব ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়েছিল। পরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। ওই সময়ের ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে হয় ইসলামী ছাত্রশিবির।

জামায়াত–শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আইনি মতামত দেওয়ার পর গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এই দল ও সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার পর তারা আর এসব নামে রাজনীতি করতে পারবে না।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় জামায়াত ও এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছিলেন সরকারের মন্ত্রীরা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় সভায় জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে একমত হন ওই জোটের নেতারা। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এখন সরকারের নির্বাহী আদেশে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হলো।

যে কারণে নিষিদ্ধ করা হলো-

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া কয়েকটি মামলার রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (পূর্ব নাম জামায়াত-ই-ইসলামী, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ) এবং এর অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে (পূর্ব নাম ইসলামী ছাত্রসংঘ) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। আপিল বিভাগ ওই রায় বহাল রেখেছেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক কালে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি এবং উসকানির মাধ্যমে জড়িত ছিল বলে সরকারের কাছে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। সরকার বিশ্বাস করে, জামায়াতে ইসলামী, শিবিরসহ এর সব অঙ্গসংগঠন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত।

আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশন ২০১৩ সালে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে। জামায়াতের পক্ষ থেকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে দলটির নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসির রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। একই অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। তবে কয়েক বছর আগে এই খসড়া তৈরি করা হলেও পরে বিষয়টি আর এগোয়নি। আইনমন্ত্রী বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনও সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী ও শিবির নিষিদ্ধ হওয়ার পর এসব সংগঠনের সদস্যদের এখন কি বিচারের আওতায় আনা হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আইন আছে। তাঁরা যদি বাংলাদেশের আইনের অধীনে কোনো অপরাধ করেন, তাহলে অবশ্যই বিচার হবে। তবে জামায়াতে ইসলামীর নতুন কর্মী, যাঁরা ১৯৭১ সালের পরে জন্ম নিয়েছেন, তাঁদের গণহারে বিচার করা হবে না।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যেতে পারে কি না, একজন সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আন্ডারগ্রাউন্ডে অনেক দল গেছে, অনেক দলের কী হয়েছে, সেই ইতিহাস জানেন। আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে পারে। সেটাকে মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতি আছে।